বাউল মতবাদের পরিচয়।

বাউল মতবাদ হলো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের এক মিশ্র ধর্মীয় ও সংগীত ঐতিহ্য, যা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া এবং বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ধারণ করে এবং একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে এর চর্চা করা হয়। এই মতবাদ মূলত মানুষের ভেতরকার আধ্যাত্মিকতার সন্ধান করে এবং এর প্রবক্তারা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও ধর্মীয় বিভেদকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। বাউলরা সাধারণত সহজ-সরল জীবনযাপন করেন এবং গুরুকে কেন্দ্র করে তাদের সাধন-ভজন পরিচালনা করেন।  
  • বাউল মতবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকলেও, ধারণা করা হয় এটি ১৫শ শতাব্দী বা তারও আগে থেকে বাংলায় বিদ্যমান।  সমসাময়িককালে বাউলদের পরিচয় লাভ করে কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের গানের মাধ্যমে।  এই মতবাদ মূলত বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের কিছু অংশে প্রচলিত। 
মূল বৈশিষ্ট্য:
  • সমন্বয়ধর্মী: 
    বাউল মতবাদ সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া এবং বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণ। 

  • সঙ্গীতের মাধ্যমে সাধনা: 
    বাউলরা গান গেয়ে এবং একতারা বাজিয়ে তাদের আধ্যাত্মিক দর্শন প্রচার করেন। 

  • সাধারণ জীবনযাপন: 
    তারা সাধারণত সাদামাটা, ভিক্ষাজীবী জীবনযাপন করেন এবং সামাজিক বিধিনিষেধ থেকে দূরে থাকেন। 

  • গোপনীয়তা: 
    বাউল সাধনা সাধারণত নিজস্ব গূঢ়শাস্ত্রে এবং গুপ্তভাবে চর্চিত হয়। 

  • গুরু-শিষ্য পরম্পরা: 
    বাউলদের মধ্যে একটি শক্তিশালী গুরু-শিষ্য সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, যা তাদের সাধন-ভজনের মূল ভিত্তি। 
আমাদের দেশের এক ধরনের মানুষ দেখা যায়, যাদের মাথায় লম্বা কেশ, মুখে লম্বা দাড়ি, গোঁফে মুখ ঢাকা, গায়ে আলখেল্লা। কারো মাথায় ও দাড়িতে জট, কারো পরনে সেলাইবিহীন লাল শালু। কারো ন্যাড়া মাথা ও গোঁফ-দাড়ি কামানো। এরাই আউল, বাউল, সহজিয়া, সাঁই, ন্যাড়া ইত্যাদি নামে পরিচিত।
ভারতীয় সমাজে কথিত শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেশির ভাগ মানুষই অতিমানুষ, মহান মানুষ, প্রতিভাবান মানুষের প্রতি ভক্তির মাত্রা বাড়াতে বাড়াতে তাকে বানিয়ে ফেলেন ঋষি, মহা-ঋষি, যোগী, মুনি, সাধক এবং সবশেষে ভগবান পর্যন্ত করে ফেলেন তাকে। (নাউজুবিল্লাহ)
ঐতিহাসিকদের মতে ভারতের নদীয়া জেলায় এর জন্ম। পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া গ্রাম হয় বাউল মতবাদের কেন্দ্রস্থল।
‘বাউল’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে। ডঃ পঞ্চানন সাহা বলেন, হিন্দী শব্দ ‘বাউরা’ বা উন্মাদ থেকে বাউল কথাটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।
আবার অনেকে মনে করেন যে, সংস্কৃত ‘বাতুন’ থেকে বাউল শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে ছূফীরা সাধু ফকীরকে বলে আউলিয়া। এই আউলিয়া শব্দটি থেকে উদ্ধৃত ‘আউল’ শব্দটি ‘বাউল’ শব্দটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই বাউলরা জাত-গাত-হিন্দু মুসলমানে বিচার করে না।
(হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক নতুন ভাবনা, পৃ. ৭৭)। ঈশ্বরপুরী, চৈতন্যদেব (১৪৮৪-১৫২৩ খৃ.),
অদ্বৈতাচার্য হরি গুরু প্রমুখের মাধ্যমে এর সূচনা। বাউল ফকীর লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০ খৃ.)-এর মাধ্যমে আনুমানিক ১৮১৫-১৮৮৬ সালে এই দর্শনের বিস্তৃতি ঘটে।
মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নদীয়ার শান্তিপুরের কাছে বুড়ল গ্রামে মুনশী আব্দুল্লাহ নামের এক লোক ছিল। শ্রী চৈতন্যের মতো একজন বড় দার্শনিকের কাছে তর্কে পরাজিত হয়ে মুনশীজী শ্রী চৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। শ্রী চৈতন্য তার নাম রেখেছিলেন যবন হরিদাস। আশুতোষ দেব তার বাংলা অভিধানে লিখেছেন, যবন হরিদাস একজন মুসলিম পণ্ডিত ছিলেন। শ্রী চৈতন্যের ভক্ত হয়ে ‘যবন হরিদাস’ হিসাবে খ্যাত হন। এই যবন হরিদাস চৈতন্যের কাছে শিক্ষা-দিক্ষা নিয়ে অশিক্ষিত মুসলিমদের মাঝে প্রচার করতে লাগলো হুঁ-হুঁ- বাবারা ভেদ আছে, ভেদ আছে। মৌলভী মাওলানাদের কাছে আসল ভেদ নেই। আসল ভেদ আমাদের কাছে আছে। এই বলে যবন হরিদাস কিছু ভক্ত তৈরি করে ফেলল। এই ভক্তরাই হল বাউল ফকীরদের দল।
(মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী, সাধু সাবধান, পৃ. ৩-৪)
এই কথার সমর্থন মিলে সুরজিৎ দাশগুপ্তের লেখায়। তিনি বলেন ‘চৈতন্যদেব হলেন বাউলদের আদি গুরু।
(সুরজিৎ দাস গুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম (কলকাতা, ১৯৯১ ইং), পৃ. ১০৪)
মূলত হিন্দু বৌদ্ধ যোগী সন্ন্যাসীদের থেকেই বাউল ন্যাড়া ফকীরদের উৎপত্তি। ইতিহাসে যাদের নাম খুঁজে পাওয়া যায়, তারা সবাই হিন্দু।
(সুরজিৎ দাস গুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ. ১০৫)
তাদের আক্বীদা হল-
(ক) বাউলরা তাদের গুরুকে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করে। তারা গুরুর মধ্যে বিধাতার প্রতিমূর্তি দেখতে পায়।
(ভারতীয় সাংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব, পৃ. ১১১; বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮৮)।
(খ) অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, লালন তার কিছু গানে সাম্যের কথা বললেও তার গানের একটি বিরাট অংশ খুবই গর্হিত ও বিকৃত যৌনাচারের রূপক স্বরূপ। তার মতে, লালন আসলে গানের নামে ছূফীতত্ত্ব ও মরমিয়া আধ্যাত্মিকতার নামে পর্ণোগ্রাফির দক্ষ কুশলী উপস্থাপক ছিলেন। গুপ্ততত্ত্বের ছদ্মাবরণে লালন দেহতত্ত্বের নামে এক কদর্য যৌনাচারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বাউলদের এক অংশ এখন লাউয়ের খোল নিয়ে গেরুয়া পরিধান করে সাধনসঙ্গিনী নিয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়। অধ্যাপক আবু জাফরের মতে ‘লালন একটি চিরস্থায়ী ফিতনা’।
(ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪৪ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, পৃ. ২৩৩)।
(গ) বাউলদের গানে যে লতা ও ত্রিবেনী শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়, তার এক বিশেষ তাৎপর্য আছে। অভিধান খুললে এর তাৎপর্য জানা যায় না। বাউল বা তান্ত্রিক সাহিত্যে লতার পারিভাষিক অর্থ হল নারীর যৌ’নাঙ্গ!
(লোকায়ত দর্শন, পৃ. ৩৯০)।
বাউল দরবেশদের মধ্যে ‘লতাসিদ্ধি’ বলে একটি কাণ্ড আছে। তাদেরকে ছালাতের কথা বললে তারা উত্তর দেয়, ইবলীস সব জায়গায় সিজদা করেছে আমরা সিজদা করব কোথায়? তাহলে কোথায় সিজদা করতে হবে- এই কথাটা আর সহজে বলবে না। তবে শিষ্য হয়ে একান্ত ভক্ত হতে পারলে তখন বলবে, ইবলীস ঐ একটা জায়গা বাদ রেখেছে ওখানেই সিজদা করতে হবে। ওটা হল ঐ ‘লতা’। বাউল ছূফীরা এভাবেই লতাসিদ্ধি পালন করে থাকে।
(উল্টা বুঝিল রাম ও সাধু সাবধান, পৃ. ৬৭)।
অতএব এই দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলে মুসলিম বলে গণ্য হওয়ার কোন সুযোগ নেই। মুসলিমের জন্য ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বিতীয় মতবাদের অনুসরণ করা হারাম।
(সূরা আলে ইমরান : ১৯ ও ৮৫)।
বাউল কপোল-কল্পিত ও প্রতারণামূলক এমন একটি সম্প্রদায়, যা মানুষকে অসভ্য, বর্বর, রুচিহীন নরপশুতে পরিণত করে। হি’ন্দু-মুসলিম একাকার করে এরা ইসলামকে চরমভাবে বিকৃত করেছে। তাওহীদকে ধ্বংস করে শিরক প্রতিষ্ঠাই ছিল এ মতবাদের মৌলিক কাজ।
অতএব এদের এই সমস্ত জঘন্য আক্বীদা-বিশ্বাস ও নোংরা কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের যেমন বিরত রাখতে হবে তেমনি এই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। ইসলামে ভণ্ডামীর স্থান নেই। বরং ইসলামী বিধান মতে এই যৌ’ন নোংরামির জন্য সরকারীভাবে রজম করে নির্মূল করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top