দেশের গ্রামাঞ্চলে ডায়াবেটিস, অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা ও কোমর ব্যথার রোগী বাড়ছে

দেশের গ্রামাঞ্চলে ডায়াবেটিস, অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা ও কোমর ব্যথার রোগী বাড়ছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এই তিন ধরনের জটিলতা নিয়ে রোগী বেশি আসে। বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশনের (এইচএসএফ) জরিপে উঠে এসেছে এ চিত্র।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ জেলায় এইচএসএফের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া ৬৮ হাজার ১৫৭ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই জরিপে। ১২টি রোগের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়– শারীরিক দুর্বলতা, কোমর ব্যথা ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫৯ শতাংশ।

জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ হাজার ৬৩৪ রোগীর (১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ) সমস্যা কোমর ব্যথা। চিকিৎসকরা জানান, কৃষিকাজে কঠোর পরিশ্রম, একটানা ভার বহন এবং দৈনন্দিন শ্রমনির্ভর জীবন– সব মিলিয়ে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে ব্যথা বাড়ছে। অনেকের ঘুম ব্যাহত হচ্ছে, কর্মক্ষমতা কমছে, মানসিক চাপও বাড়ছে। অপুষ্টি ও দুর্বলতায় ভুগছেন ১০ হাজার ১১৩ জন (১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ)। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আট হাজার ৮৪৮ জন (১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ)। এ ছাড়া সাধারণ সর্দিতে চিকিৎসা নিয়েছেন পাঁচ হাজার ৮২৬ জন, উচ্চ রক্তচাপে পাঁচ হাজার ৫৬১ জন, এলার্জির কারণে পাঁচ হাজার ৫৩১ জন এবং খোসপাঁচড়ার কারণে চার হাজার ৪৬৩ জন। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে খোসপাঁচড়া তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

যাতায়াত ও ওষুধ সংকটে ভোগান্তি

গত ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ভগবানচরে এইচএসএফ আয়োজিত চিকিৎসা ক্যাম্পে এসেছিলেন নবীরন বেগম (৫৯)। তিনি বলেন, ‘কোমর ব্যথায় হাঁটাচলা করতে পারি না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে নদী পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। সব সময় ওষুধও থাকে না। সন্তান নিয়ে যেতে আরও ঝুঁকি। আমাদের মতো মানুষের চিকিৎসা পেতে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়।’

চিকিৎসা নিতে আসা ভগবানচরের পাটগ্রামের আসমা (৩৭) বলেন, ‘চার বছর আগে সন্তান জন্মের সময় তাঁর ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। সরকারিভাবে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকে অনেক দিন ধরে ওষুধ নেই। কয়েকবার গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।’ এই গ্রামের একটি মাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র ভগবানচর কমিউনিটি ক্লিনিক। এখানকার স্বাস্থ্যকর্মী রিতা রানী জানান, চর এলাকায় রোগী বাড়লেও পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন। গ্রামে দ্রুত বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী।
শারীরিক জটিলতার জন্য জীবনযাত্রার

পরিবর্তন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অনেকের ক্ষেত্রে পরিশ্রম কমে যাওয়া– এসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদনে। জরিপ কাজে যুক্ত ছিলেন হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশনের মেডিকেল অফিসার ডা. আবু তলহা মুসতাকিম। তিনি সমকালকে বলেন, গ্রামে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব পড়েছে। হাঁটাচলা কমে গেছে, সারাদিন মোবাইল ফোন নিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকে অনেকে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক একভাবে কাজ করায় কোমর ব্যথা ও দুর্বলতা বাড়ছে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত বাড়ার পেছনে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, সচেতনতার অভাব ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ঘাটতি বড় কারণ।

ঋতু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কারণে সর্দিকাশি ও স্ক্যাবিস বাড়ছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শরীরচর্চা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস– এসবই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।

এইচএসএফ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ মুকিত বলেন, গ্রামে নারী ও শিশুরা বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসা ও ওষুধের ঘাটতি আছে। গ্রামীণ ক্লিনিকগুলোর সক্ষমতা কম। সমাজের সক্ষম ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব। তিনি জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি চিকিৎসকদের যুক্ত করে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের গবেষণা পরিচালক (পুষ্টি) মোস্তফা ফারুক আল বান্না বলেন, অপুষ্টির কারণে দেশে খর্বকায় শিশু বাড়ছে। সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণিতে অপুষ্টির হার ৩৪ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অপুষ্টি দূর করার উদ্যোগ আছে। ব্যক্তি পর্যায়ে নিজের জমিতে সবজি চাষ বা শহরে ছাদবাগান করেও অপুষ্টি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া যায়।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা.  এ কে আজাদ খান বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এর মধ্যে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন। উদ্বেগের কারণ হলো, আক্রান্তদের অর্ধেক সংখ্যকেই জানে না তারা রোগী। ডায়াবেটিস আজীবনের রোগ। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, শৃঙ্খলা মেনে কাজকর্ম, বিশ্রাম ও ঘুমের মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top