হার্ভার্ড থেকে ১০ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলাম: জ্যাক মা

জ্যাক মা ১৯৬৪ সালে পূর্ব চীনের চচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার এক বড়ভাই এবং ছোট বোন ছিল। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল না। জ্যাক এর বাবা-মা গান গেয়ে বেড়াতেন। মা এর দাদা ছিলেন চীনের জাতীয়তাবাদী দলের একজন স্থানীয় অফিসার। চেয়ারম্যান মাও জাতীয়তাবাদী দলকে হারিয়ে দেবার পরে মা এর দাদাকে কম্যুনিস্ট পার্টির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

ছাত্র হিসেবে জ্যাক মা ভাল ছিলেন না। জাতীয় কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় তিনি দুইবার ফেল করেন। তৃতীয়বার পাস করার পরে তিনি হুয়াংঝু টিচার্স ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হবার সুযোগ পান। ১৯৮৮ সালে তিনি গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কলেজে পড়া অবস্থায় তার স্ত্রী ঝাং ইং এর সাথে তার পরিচয়, পরিণয় এবং পাস করে তারা বিয়ে করেন।

প্রাইমারিতে দুইবার ফেল…
মাধ্যমিকে তিনবার ফেল…
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষায় তিনবার ফেল… চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে ৩০ বার ব্যর্থ হয়েছি আমি।
চীনে যখন কেএফসি আসে তখন ২৪ জন চাকরির জন্য আবেদন করে৷ এর মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হয়৷ শুধুমাত্র একজন বাদ পড়ে, আর সেই ব্যক্তিটি আমি।
এমনও দেখা গেছে চাকরির জন্য পাঁচ জন আবেদন করেছে তন্মধ্যে চার জনের চাকরি হয়েছে বাদ.পড়েছি শুধুই আমি। প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যানই দেখেছি আমি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ১০বার আবেদন করে ১০বারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি।
এতক্ষণ যার কথা বলেছি তিনি হলেন পৃথিবীর অন্যতম বড় অনলাইন ভিত্তিক কোম্পানি আলিবাবা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জ্যাক মা। তার জন্ম চীনের জিজিয়াং প্রদেশে।
ফোবর্স ম্যাগাজিনের হিসেবে জ্যাক মা পৃথিবীর ৩৩ তম ধনী ব্যক্তি। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
জ্যাক মার জীবনে এতবার ব্যার্থ হওয়ার পরও বড় হওয়ার,প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা থেকে বিন্দু মাত্র পিছপা হন নি। অবিরাম চেষ্টা চিলিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন।
যেই জ্যাক মা চাকরির জন্য ৩০ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন সেই জ্যাক মার প্রতিষ্ঠান আলিবাবা ডটকম চীনে নতুন করে ১৪ মিলিয়ন চাকরি তৈরি করেছে।
জ্যাক মা যখন আলিবাবা প্রতিষ্ঠা করেন তখন সবাই তাকে পাগল বলত৷ টাইম মেগাজিনে জ্যাক মা কে পাগল জ্যাক বলে অভিহিত করেছিল।
কিন্তু জ্যাক মা আশাহত হন নি। তিনি চলেছেন আপন গতিতেই৷ তার সেই গতিই তাকে পৌঁছে দিয়েছে সফলতার দ্বার প্রান্তে।
তিনি বলেন, যুবকদের সামনে রয়েছে অফুরন্ত সময়৷ আর সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে তারাও হতে পারে পৃথিবী বাসির কাছে অনুসরণীয় ব্যাক্তিত্ব৷ ইচ্ছা করলেই নিজেকে উদাহরণের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
জ্যাক মার একটি বিখ্যাত উক্তি, তিনি বলেছিলেন “আমার মনে হয় পাগল হওয়াই ভাল। আমরা পাগল কিন্তু নির্বোধ নই “

চলতি বছরের শুরুর দিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশ নিতে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিক চার্লি রোজের। বিশেষ এই সাক্ষাৎকারে তিনি তার সফলতার গল্প তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে তিনি ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও দিয়েছেন।

প্রিয় টেক পাঠকদের জন্য তার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো তুলে ধরা হল:

১. আত্মবিশ্বাস: জ্যাক মা যখন প্রথম আলিবাবা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি তার ১৭ জন বন্ধুকে বাসায় ডেকে আনেন। তাদের সাথে তিনি তার আইডিয়ার কথা শেয়ার করেন। কিন্তু সবাই তার এই আইডিয়াকে ‘স্টুপিড আইডিয়া’ বলে চলে যায়। পুরো রাত জুড়ে জ্যাক মা তার উদ্যোগের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেন এবং পরের দিন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে অন্যরা যাই বলুক, তিনি এই কাজটি করবেনই।

২. অভ্যাসে পরিণত করতে হবে: ইংরেজি কিছুটা দুর্বল ছিলেন তিনি। আর তাই তিনি তার স্বল্প ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে প্রতিদিন সকালে সাংরি লা হোটেলে চলে যেতেন। সেখানে আসা পশ্চিমা পর্যটকদের গাইড হিসেবে তাদের নিয়ে যেতেন নিজ গ্রামে। আর এর ফলে তাদের সাথে কথা বলার ছলে নিজের ইংরেজি শেখার অনুশীলনও হয়ে যেতো। টানা ৯ বছর ধরেই কাজটি করেন তিনি।

৩. হাল ছাড়লে চলবে না: কোন কিছু চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, এই ঘটনার সাথে জ্যাক মা’র ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। ৩০টি চাকরির জন্য চেষ্টা করেও হয়েছিলেন ব্যর্থ। এমনকি কেএফসি’তে তার সাথে আবেদন করা ২৪ জন চাকরি পেলেও একমাত্র তাকেই নেওয়া হয়নি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ১০ বার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সে ভাগ্যও হয়নি তার। আর এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন চার্লি রোজ। উত্তরে তিনি বলেন, “হয়তো কোন একদিন আমি হার্ভার্ডে শিক্ষকতা করতে যাব।”

৪. উদ্যোগ নিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে: ৯০’র দশকে জ্যাক মা ইন্টারনেটে প্রথম যে কীওয়ার্ড লিখে সার্চ দিয়েছিলেন, সেটি ছিল ‘beer’। আর এরপর তিনি এরসাথে ‘china’ লিখে আবার সার্চ দেন এবং কিছু খুঁজে পাননি। আর এরপরই তার মাথায় ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসার ধারণা আসে।

৫. ভয় করলে চলবে না: সেই ধারণা নিয়েই তিনি এবং তার স্ত্রী মিলে শুরু করেন ‘China Pages’ নামক একটি ব্যবসা। আর এর জন্য তারা ২ লাখ ডলার ধারও করেন। এই ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “আমি তখন পারসোনাল কম্পিউটার কিংবা ইমেইল সম্পর্কে কিছু জানতাম না। এর আগে আমি কখনও কীবোর্ডও ধরে দেখিনি। আর তাই আমি নিজেকে ‘অন্ধ বাঘের পিঠে চড়ে বসা অন্ধ ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করি।”

৬. শত্রু থাকা চলবে না: প্রতিদ্বন্দ্বীদের কখনোই শত্রু মনে করেন না জ্যাক মা। বরং তিনি তাদের এভাবেই গন্য করেন যাদের কাছ থেকে কিছু শেখা যাবে। “একজন সত্যিকারের ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তার কখনও শত্রু থাকে না।”